বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০২:৫৭ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টারঃ গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। এতে গাইবান্ধা পৌর এলাকাসহ চারটি উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প¬াবিত হয়েছে। পানিবন্দী মানুষ এবং বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিত বন্যার্ত মানুষেরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। জেলার একটি পৌরসভা ও ৩৭টি ইউনিয়নের ২৫২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৪ লাখ মানুষ। পানিবন্দি এসব মানুষ কোন রকমে আশ্রয় নিয়েছেন উচু জায়গা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এখন অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
এদিকে ত্রিমোহিনী থেকে বোনারপাড়া স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় রেললাইনের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত অব্যাহত থাকায় লালমনিরহাট-সান্তাহার রুটে গাইবান্ধার ত্রিমোহিনী রেল স্টেশন থেকে বোনারপাড়া জংশন পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে ট্রেন যাত্রীরা চরম বিপাকে পড়েছে।
গাইবান্ধা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবুল কাশেম (০১৮৬৭-৭২৬৪৬২) জানান, লালমনিরহাট-সান্তাহার রুটে গাইবান্ধার ত্রিমোহিনী রেল স্টেশন থেকে বোনারপাড়া জংশন পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে রেল লাইন ডুবে যাওয়ায় গত বুধবার সকাল ১১টা থেকে ওই রুটে সরাসরি এখন পর্যন্ত সকল প্রকার ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এখন থেকে ডাউন ট্রেনগুলো গাইবান্ধা রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত এবং আপ ট্রেনগুলো বোনারপাড়া পর্যন্ত চলাচল করছে। তবে আন্তনগর লালমনি এক্সপ্রেস ও রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন বিকল্পভাবে রংপুর-পার্বতীপুর-সান্তাহার হয়ে ঢাকায় চলাচল করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অপরদিকে গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের কদমের তল থেকে ফকিরপাড়া পর্যন্ত এবং গাইবান্ধা-ফুলছড়ি-সাঘাটা সড়ক, গাইবান্ধা-বালাসীঘাট সড়ক, গাইবান্ধা-বোনারপাড়া সড়ক এখন হাঁটু পানিতে নিমজ্জিত। ফলে সড়কগুলোতে সকল প্রকার যানবাহন ও পথচারিদের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে গাইবান্ধা শহরের পিকে বিশ্বাস রোড, সান্তার পট্টি রোড, স্টেশন রোডের কাচারী বাজার থেকে পুরাতন জেলখানা পর্যন্ত, ভিএইড রোড, ডেভিড কোম্পানীপাড়ার ২টি সড়ক, মুন্সিপাড়া শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়ক, ব্রীজ রোড কালিবাড়িপাড়া সড়ক, কুটিপাড়া সড়ক, পূর্বপাড়া সড়ক, একোয়াষ্টেটপাড়া সড়ক, বানিয়ারজান সড়ক, পিকে বিশ্বাস সড়ক, পুলিশ লাইন সংলগ্ন সড়ক হাঁটু পানিতে নিমজ্জিত। গাইবান্ধা শহরের ডেভিট কোম্পানি পাড়া, মুন্সিপাড়া, কুটিপাড়া, মিতালী বাজার, বেজির ভিটা, নতুন বাজার, পূর্বপাড়া, জুম্মাপাড়া, পুরাতন বাজার, ব্রীজ রোড (রাজস্বপাড়া), ব্রীজ রোড কালিবাড়ি পাড়া, মাস্টারপাড়া, মধ্যপাড়া, গোরস্থানপাড়া, আদর্শপাড়া, মমিনপাড়া, পুলবন্দি, বানিয়ারজান, দক্ষিণ বানিয়ারজান, ভি-এইড রোড, কালিবাড়িপাড়া, বাংলাবাজার, পুলিশ লাইন, নশরৎপুর, ফলিয়া, বোয়ালী, ত্রিমোহনী, বাদিয়াখালীসহ অধিকাংশ এলাকার বসতবাড়িতে কোথাও হাটু পানি কোথাও কোমর পানিতে ডুবে আছে। এতে করে পানিবন্দী মানুষদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে চরাঞ্চলের পানিবন্দি মানুষদের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। বিশেষ করে গবাদিপশু যেগুলো চরাঞ্চলে আটকা পড়েছে সেগুলো যানবাহনের অভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া যাচ্ছে না। এছাড়া গবাদি পশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালী ইউনিয়নের সিংড়িয়া, উদাখালী, পূর্ব ছালুয়া, কাঠুর, উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর ও গজারিয়া ইউনিয়নের কাতলামারীতে এধরণের অনেক পরিবার এখনও চরাঞ্চলে আটকা পড়ে রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটেও তারা ভুগছে। অন্যদিকে শহর সংলগ্ন বেশকিছু বাধ ভেঙে যাওযায় গত মঙ্গলবার গাইবান্ধা শহরের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত বন্যা দুর্গত এলাকার ৪ উপজেলার জন্য ৪৫ মেট্রিক টন করে চাল নতুন করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গাইবান্ধা পৌরসভার মেয়র অ্যাড. শাহ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবীর মিলন জানান, এখন পর্যন্ত কোন সরকারি ত্রাণ সামগ্রী পাওয়া যায়নি। তবে এব্যাপারে জেলা প্রশাসকের কাছে জরুরী ভিত্তিতে ত্রাণ সহায়তার জন্য আবেদন করা হয়েছে। পৌর এলাকার বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিত পরিবারগুলোর মধ্যে পৌরসভার মেয়রের পক্ষ থেকে দুবেলা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এরমধ্যে রয়েছে তৈরী খাবার খিচুরি ও শুকনো খাবার। এছাড়াও জরুরী ভিত্তিতে ওষুধ, স্যালাইনও সরবরাহ করা হচ্ছে। পৌরসভার স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিটি কেন্দ্রে জরুরী ওষুধপত্রসহ বন্যা দুর্গত এলাকায় সার্বক্ষনিক কর্মরত রয়েছে। তদুপরি পৌরসভার নিজ উদ্যোগে প্রতিটি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে অস্থায়ী টয়লেট নির্মাণ, বিশুদ্ধ পানির জন্য নলকুপ স্থাপন করে দিয়েছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১৪৪ সে.মি ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৮৫ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
চরম হুমকির মুখে সুন্দরগঞ্জের চন্ডিপুর-লালচামার ওয়াপদা বাঁধঃ সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। চরম হুমকির মুখে চন্ডিপুর হতে লালচামার বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ। যে কোন মুহুর্তে বাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে যেতে পারে হাজার হাজার পরিবার। বাধ ভাঙ্গার ভয়াবহ আতংকে ভুগছে অত্র এলাকার লোকজন। গত বৃহস্পতিবার সকাল হতে বন্যার পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। অপরদিকে ওয়াবদা বাধের ডানতীর বেলকা ইউনিয়নের ধুমাইটারি মাদরাসা থেকে বেলকা পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে ওয়াবদা বাধের রাস্তায় অনেক বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় পথচারীদের পারাপারে দারুন বিঘেœর সৃষ্টি হয়েছে। যে কোন মুহুত্বে পথচারীরা বড় কোন দুর্ঘটনার স্বীকার হতে পারে। এ এলাকায়ও আর একটু পানি বৃদ্ধি পেলে ওয়াবদা বাধ ছিড়ে তলিয় যাবে হাজার হাজার পরিবার, রাস্তাঘাট, ব্রীজ কালভার্ট, উঠতি ফসল, গাছপালা সহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এদিকে চন্ডিপুর হতে লালচামার ওয়াবদা বাধে কয়েকটি স্থানে বাধ উপচে পানি ভিতরে প্রবেশ করতে থাকলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্বচেষ্ট প্রচেষ্টায় বালির বস্তা ফেলে তা নিয়ন্ত্রনে আনা হয়। এছাড়াও চন্ডিপুর হতে লালচামার ওয়াবদা বাধটির কয়েকটি স্থানে বাধে বড় ধরনের ফুটার সৃষ্টি হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড অতিদ্রুত বস্তা ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন সার্বক্ষনিক বাধে টহল দিতে দেখা যাচ্ছে এবং যে কোন সমস্যার সৃষ্টি তা তাৎক্ষনিকভাবে স্বাভাবিক রাখার জন্য জোড় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
বন্যা শিবিরে খাদ্য ও ওষুধ সংকটঃ টানা ১০ দিন ধরে পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহরুপ নিয়েছে। বন্যা শিবির গুলোতে দেখা দিয়েছে সুপেয় পানিসহ খাদ্য ও ওষুধ সংকট। উপজেলায় ২৫টি নির্ধারিত বন্যা শিবির ছাড়া বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ভ্রামম্যান আশ্রয় কেন্দ্র। গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে তিস্তার চরাঞ্চলের বসতবাড়ির ঘরের চালে উঠে গেছে পানি। কোথাও ঠাই নেই চরবাসীর। বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, ঘরবাড়ি ছেড়ে গৃহপালিত পশু নিয়ে চরবাসী ছুঁটছে আশ্রয় কেন্দ্র, উচুস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং স্বজনদের বাড়িতে। উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চন্ডিপুর, শ্রীপুর ও কপাসিয়া ইউনিয়নের সবগুলো ওয়ার্ড এখন পানির নিচে। পানিবন্দি পরিবারগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। ডুবে গেছে তরিতরকারিসহ সব ফসলের ক্ষেত। পানি বন্দি হয়ে পড়েছে ৬টি ইউনিয়নের কমপক্ষে ৩০ হাজার পরিবার। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের মাঝে এ পর্যন্ত ১০০ মেট্রিকটন চাল ও ১ হাজার কাটুন শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে হাজারও একক জমির মৌসুমি ফসল। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের যোগায়োগ ব্যবস্থা। ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়া পরিবারগুলো নৌ-ডাকাতির শঙ্কায় রয়েছে। অনেক চরবাসী রাত জেগে ঘরের চালে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ি পাহাড়া দিচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সোলেমান আলী জানান, পানিবন্দি পরিবারদের মাঝে শুকনো খাবার, ত্রাণ সামগ্রী ও গো-খাদ্য বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে ১০০ মেট্রিকটন চাল বিতরণ করা হয়েছে। আরও ত্রাণ সামগ্রীর জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রাই তা বিতরণ করা হবে।
গোবিন্দগঞ্জ প্রতিনিধিঃ গোবিন্দগঞ্জে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে এ বারের বন্যা। গতকাল শুক্রবার ভোরে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের চরবালুয়া কাটাখালী নদী রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে মহিমাগঞ্জ, কোচাশহর, শালমারা ও শিবপুর ইউনিয়নের বাড়ী ঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন করে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এ ছাড়াও কৃষি ফসলি জমিসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে। মৎস্য চাষীদের পুকুরে বন্যার পানি ঢুকে মাছ বের হয়ে যাওয়ায় চাষীদের মাথায় হাঁত। বন্যায় বানভাসি মানুষেরা নিজেদের বাড়ী ঘর ছেড়ে উঁচু স্থানের সন্ধানে আশ্রয়ের জন্য ছুঁটছে। এতে তারা বিপাকে পড়েছে গুবাদি পশু গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি নিয়ে। এসব পরিবারে দেখা দিয়েছে শুকনা খাবারের অভাব। অনেক পরিবারে শুকনা জ্বালানি না থাকায় বিপাকে পড়েছে তারা। এদিকে করতোয়া, কাটাখালী, আলাই ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি এখন বিপদ সীমা ছুঁই ছুঁই করায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে। গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভাসহ দরবস্ত, তালুককানুপুর, হরিরামপুর, রাখালবুরুজ, নাকাই, ফুলবাড়ী ইউনিয়ন এখন বন্যার পানিতে ভাসছে এবং সাপমারা, গুমানীগঞ্জ ও কামারদহ ইউনিয়নের একাংশে বন্যার পানি প্রবেশ করায় ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশংকা করছে কৃষকেরা। তবে বানভাসি মানুষেরা অভিযোগ করছে এখন পর্যন্ত সরকারী ও বেসরকারী ভাবে ত্রাণ নিয়ে তাদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি।